৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
Advertisement

‘লুনাটিক’স্ হাট’ নাকি ‘জেলখানা’…? ‘চন্দ্রাহতের কুটির’ নাটকটি ঐতিহাসিক নির্মাণ করলেন পৃথ্বীশ রাণা

ফারুক আহমেদ : চাঁদের রাতে পাহাড়ের রূপ দেখতে গিয়ে বরফে মারা গিয়েছিলেন ‘লোটাস ইটার’-এর নায়ক। ভালোবাসার জন্য চন্দ্রাহত হলেন কে? মনোতোষ আর বাশো যখন একই পাহাড়ের দুই ঢাল বেয়ে নেমে এসে মিলে যান, যেখানে বাস্তব আর পরাবাস্তব হাত ধরাধরি করে চলে। মার্কেজীয় জাদুবাস্তবতার পরতে-পরতে মুহূর্তের ঐশ্বর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই নির্মাণে। সময়ের নিদান হাঁকা ‘জাগতে রহো’ স্মরণ করিয়ে দেয় শিখণ্ডী সিস্টেমের নগ্নতাকে। যে শিবিরে বন্দি যত উন্মাদের আর্তনাদ-আকুতি, সমবেত সঙ্গীতের শতজলঝরনার উচ্ছ্বাস হয়ে ভেসে আসে। চরিত্রগুলির ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয় সময়ের ধারাভাষ্য। ব্যক্তিগত বিশ্বাস, মতাদর্শ, আবেগ-অনুভূতি যেখানে বিশ্বনাগরিকের সর্বজনীনতায় রূপান্তরিত হয়। অভিনয়ের মূল ধারাটি যেখানে ক্লাসিক হয়ে ওঠে, চেরী ফুল ফোটে, জাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে যেখানে ‘রাজার চিঠি’ আসে, ছুটির খবর আসে, মুক্তির হাওয়া যেখানে বয়ে যায় নিরন্তর, মাস-বর্ষ-দিবস শেষে মনোতোষ আর বাশোর যুগলবন্দি অস্তিত্বের ঘন ছায়া নেমে আসে ‘চন্দ্রাহতের কুটির’-এ। ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, নির্দেশক, কারিগরি কারুকার্য, অভিনেতাদের নিপুণ ছন্দরীতি এবং সঙ্গীত যেখানে মহাসঙ্গীত হয়ে ভেসে এসে এ নাট্যের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটায়! চিন্তার তরঙ্গে ঘা দেয়, ঠিক ওই সমবেত ঘণ্টাধ্বনির মতোই।

 

Advertisement

 

 

Advertisement

 

ডার্ক স্টুডিও প্রযোজিত এবং নাটকীয় নিবেদিত রবিশঙ্কর বল-এর লেখা অবলম্বনে ‘চন্দ্রাহতের কুটির’ এক অনবদ্য নাট্যরূপ উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়-এর তবে এই নাটকের নায়ক পরিচালক নিজে। পৃথ্বীশ রাণা বারবার প্রমাণ করেছেন তার অপরূপ চিন্তা শক্তির ক্ষমতা। আগেও বিভিন্ন নাটকে তার মঞ্চ ও আলোর কাজ দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। পরিচালক আবার জাত চেনালেন তার শিল্পে। পৃথ্বীশকে নিয়ে আরো অনেক কিছু বলার আছে, সেগুলো নয় পরে বলছি। এছাড়াও আকর্ষণ করে এই নাটকের মঞ্চ ও আলোক শিল্পী অভ্র দাশগুপ্ত। তরুণ প্রতিভা। এক টুকরো কুটির যেনো মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি ইমব্যালেন্স মঞ্চ, যার কোনো অংশই সমান নয় ওই কুটিরে থাকা চরিত্রগুলির মতোই। তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করেছে আলো। পৃথ্বীশ-এর পর, এই প্রজন্মের এই প্রথম কেউ যিনি মঞ্চ এবং আলো সমান দক্ষতায় করতে পারেন। আহা, কত রং, এত রং দিয়েও যে এত পুরনো একটা আলো তৈরি করা যায়, এবং আলো দিয়েও যে অন্ধকার তৈরি করা যায়, তা কিন্তু বাংলা থিয়েটারে বিরল। এছাড়াও নজর কেড়েছেন, সৃজনশীল সঙ্গীত নির্মাতা দেবরাজ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত তন্ময় পাল। আবহ বিশ্বজিৎ বিশ্বাস। পোশাক মৌমিতা দত্ত। অঙ্গবিন্যাস বুদ্ধদেব দাস। রূপসজ্জা সুরজিৎ পাল। মঞ্চ উপকরণ পার্থ সারথি সরকার। প্রথম শো হাউস ফুল ৭ জুলাই ২০২৪ রবিবার মিনার্ভা থিয়েটার দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।

Advertisement

 

 

Advertisement

 

 

Advertisement

 

মনের আকাশ জুড়ে দাগ কেটে গিয়েছে ‘চন্দ্রাহতের কুটির’। অপূর্ব সুন্দর পরিবেশন দর্শকদের মনে গভীরভাবে বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়ে যায় এই নাটকটি। মাদকদ্রব্য থেকে দূর থাকার বার্তা। দর্শকদের মুগ্ধ করে নবাগত কয়েকজনের তুখোড় অভিনয়। পৃথ্বীশ রাণা সমাজকে এই সময়কে সচেতন করতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করলেন এই থিয়েটার নির্মাণের মধ্য দিয়ে। নাট্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত, পৃথ্বীশ রাণা নাট্য জগতের একজন স্বনামধন্য প্রাণপুরুষ। খুব ছোট বয়সে নাটক চর্চায় হাতেখড়ি হলেও ২০০৯ সালের শেষকালে কালিন্দী ব্রাত্যজন নাট্যদলে যোগদান করেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রযোজনায় মঞ্চ পরিকল্পনা, আলোক পরিকল্পনা বা কারিগরি সহায়তা ইত্যাদি বিভাগে নিজের শৈল্পিক চেতন ও নৈপুণ্যের প্রকাশ ঘটান। পৃথ্বীশ রাণা মঞ্চ পরিকল্পক বা আলোক পরিকল্পক হিসেবে ক্যানভাসার, ব্যোমকেশ, জায়মান, আনন্দীবাই, চন্দ্রগুপ্ত, হাজু মিঁঞার কিস্ সা, পদ্মগোখরো, তক্ষক, য্যায়সা কা ত্যায়সা, চিরকুমার সভা, হড়পা বান, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, অথৈ জল, জতুগৃহ, কাঁকড়া, মুম্বাই নাইটস্, অমূল্যর ডায়েরি, মেঘে ঢাকা তারা, বোমা, পড়ে পাওয়া ষোলো আনা, তিন তস্কর, ভয়, অরণ্যদেব, দেবদাস, বিবর, উলঙ্গ প্রজা পরিহিত রাজা, ট্যাঙ্কি সাফ, গিরিগিটি, নাসিকা পুরাণ, আলাউদ্দিন ও পদ্মাবতী, পিতৃভূমি, বিনয়ের জীবন প্রভৃতি। এছাড়াও বিভিন্ন নাটকে নিজের কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করেন। ছোটদের নিয়ে থিয়েটারের কাজ করেছেন বেশ কিছু। যেমন তাসের দেশ, লক্ষ্মণের শক্তিশেল, চাঁদের পাহাড়, ডমরু চরিত কথা, ভোম্বল সর্দার, পাণ্ডব গোয়েন্দা প্রভৃতি নাটক। কারিগরি সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন চেনা দুঃখ চেনা সুখ, সিনেমার মতো, কে?, অপারেশন ২০১৪, আলতাফ গোমস্, অদ্য শেষ রজনী, ২১ গ্রাম, পাঁচের পাঁচালী, মীরজাফর প্রভৃতি নাটকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনস্থ মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রে বেশ কিছু বছর কো-অর্ডিনেটর পদে চাকরি করেন পৃথ্বীশ রাণা। পৃথ্বীশের তুখোড় সম্পাদনা ও নির্দেশনায় ইতিপূর্বে প্রায় ১০০টি শো হাউস ফুল নাটক ‘বাদাবন’ দর্শকদের মনে গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল।

Advertisement

 

 

Advertisement

 

এবার ডার্ক স্টুডিও প্রযোজিত ‘চন্দ্রাহতের কুটির’ চাঁদের আলোর অন্ধকারে অমাবস্যার গান শোনাও থিয়েটার দর্শকদের উপহার দিলেন পৃথ্বীশ রাণা। ‘চন্দ্রাহতের কুটির’ থিয়েটারে যাঁরা উল্লেখিত অভিনয় করেছেন তাঁরা হলেন, পার্থসারথি সরকার-মনোতোষ বসু। নীলাঞ্জন গাঙ্গুলি-মাৎসুও বাশো। প্রলয় দত্ত-বঙ্কিম। রাজরাখাল-হীরালাল। সন্দীপ বিশ্বাস-কপিল। স্বাগত চ্যাটার্জি-ইকবাল। সৌপর্ণ পাত্র-মনোময়। মৌমিতা দত্ত-চেরী।

Advertisement

বিমুগ্ধ করে সকল দর্শকদের।

দ্বিতীয় শো ১৪ জুন রবিবার মধুসূদন মঞ্চে ৬.৩০ টায়।

Advertisement

 

আলোচক: সম্পাদক ও প্রকাশক উদার আকাশ, কলকাতা, ভারত।

Advertisement